সরকারি ১৪৪০ টাকা বেধে দিলেও ব্যাপারীরা কিনচ্ছেন ৭০০ টাকায়
ধানের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হাওড়ের কৃষকরা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৪-০৫-২০২৬ ০৩:৫৭:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-০৫-২০২৬ ০৩:৫৭:০৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
সুনামগঞ্জে সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলেও এ তথ্য অনেক প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছেনি। এর সুযোগে ব্যাপারীরা খলা (ধান শুকানোর জায়গা) থেকেই কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন, ফলে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সুনামগঞ্জের অনেক কৃষক।
সুনামগঞ্জের দেখার হাওর পাড়ের গোবিন্দপুর গ্রামের দুই সহোদর এমরান মিয়া ও সামরান মিয়া। ধার-দেনা আর হাড়ভাঙা খাটুনিতে ১৭ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তারা। খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। ১০ বিঘা জমির আধা-পাকা ধান কোনোমতে কেটে খলায় তুললেও বাকি ৭ বিঘা এখন পানির নিচে। চড়া মূল্যের কারণে শ্রমিক মিলছে না, আর হারভেস্টার মেশিনও নামানো যাচ্ছে না জলাবদ্ধ জমিতে। ফসলের এই দশায় দুই ভাইয়ের চোখে এখন শুধুই হতাশা।
শুধু এমরান বা সামরান নন, সুনামগঞ্জের হাজারো কৃষকের গল্প এখন একই রকম। বৈরী আবহাওয়া আর অকাল বন্যার আশঙ্কায় যখন কৃষকের চোখে ঘুম নেই, তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধানের ন্যায্য বাজারমূল্য না পাওয়া।
সরকার এ বছর ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা। গতকাল রোববার (৩ মে) থেকে সুনামগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধান কেনা শুরু হয়েছে, যা চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের বড় একটি অংশই জানেন না ধানের এই সরকারি দামের কথা। সরকারের প্রচারণার অভাব আর ফরিয়াবাজদের দৌরাত্ম্যে কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন পানির দরে ধান বিক্রি করতে।
লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের জানিগাঁও গ্রামের কৃষক জব্বার মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ঋণ কইরা ৯ বিঘা জমি চাষ করছি। ধান খলায় আনার পরেই বেপারীরা দাম হাঁকাচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকা। ভেজা ধান কেউ নিতে চায় না, তাই বাধ্য হয়েই কম দামে বেচে দিছি। সরকার যে ১৪৪০ টাকায় ধান কিনবে, সেই খবর তো আমাদের কেউ জানায় নাই।
সুনামগঞ্জের একাধিক হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হলেও মাঠ পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছায়নি। এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে ফরিয়া ও দাদন ব্যবসায়ীরা। তারা একেকটি খলায় গিয়ে কৃষকদের বাধ্য করছেন নামমাত্র মূল্যে ধান ছেড়ে দিতে। ভেজা ধান কিংবা চারা গজানো ধানের অজুহাতে প্রতি মণ ধানের দাম দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। অনেক কৃষক আগে থেকে দাদন (অগ্রিম টাকা) নেওয়ায় এখন পানির দরে ধান তুলে দিচ্ছেন মহাজনদের হাতে।
জলিলপুর গ্রামের কৃষাণী রংমালা বিবি জানান এক করুণ চিত্র। তিনি বলেন, এবার সব ধান ভেজা। রোদ নাই বলে খলাতেই ধান নষ্ট হচ্ছে, এমনকি অনেক ধানে বীজ গজিয়ে গেছে। কাল এক বেপারী এসে ৭০০ টাকা মণ দাম বলে গেছে। আমরা সাধারণ মানুষ, সরকার ধান কিনবে কি না বা কোথায় নেবে, তা আমাদের জানা নাই। তাই খলা থেকেই ধান বিক্রি করে দিচ্ছি।
তবে জেলা খাদ্য বিভাগ দাবি করছে, তারা কৃষকদের সচেতন করতে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বি এম মুশফিকুর রহমান জানান, জেলায় এ বছর ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ধানের দাম জানাতে আমরা ইতিমধ্যে মাইকিং শুরু করেছি। আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় অনেক কৃষকের ধান ভেজা। আমরা নির্দেশ দিয়েছি, কৃষকরা এলএসডিতে (লোকাল সাপ্লাই ডিপো) ধান নিয়ে এসে সেখানে শুকিয়ে তারপর গুদামে জমা দিতে পারবেন। আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান নিবো।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. আবদুর রব বলেন, ধানের আর্দ্রতা ঠিক রেখে বিক্রি করতে হবে। ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা না থাকলে ধান ক্রয় করা হবে না। এজন্য বিক্রিত ধান নিয়ে আসার আগে ধানের স্যাম্পল আনতে হবে।
প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, কেবল মাইকিং করে দায় সারলে হবে না। ধান ক্রয়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং ফরিয়াবাজদের সিন্ডিকেট ভাঙতে মাঠ পর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে। অন্যথায়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো সোনার ফসল মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটেই চলে যাবে, আর কৃষক থেকে যাবে ঋণের জালে।
উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট আবাদের ৬৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর মাঝে হাওর এলাকায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে অন্যদিকে নন-হাওর এলাকায় ১৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। জেলায় প্রায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স